ডেক্স রিপোর্ট:
গত বছরের জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল আজ সোমবার (১৭ নভেম্বর, ২০২৫) এই বহুল আলোচিত মামলার রায় ঘোষণা করেন।
বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন ট্রাইব্যুনালের অন্য দুই সদস্য হলেন- বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
জনাকীর্ণ আদালতে রায় ঘোষণার সময় জানানো হয়, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আনা তিনটি অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। এর মধ্যে একটি অভিযোগে তাঁকে আমৃত্যু কারাদণ্ড এবং অন্য দুটি গুরুতর অপরাধে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়েছে।
এই মামলায় শেখ হাসিনাসহ মোট তিনজনের বিরুদ্ধে রায় ঘোষণা করা হয়। অন্য দুই আসামি হলেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান এবং পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন।
ট্রাইব্যুনাল মোট পাঁচটি অভিযোগের ভিত্তিতে বিচার কার্য সম্পন্ন করে। এই পাঁচটি অভিযোগের মধ্যে রয়েছে:
- উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়া।
- হেলিকপ্টার, ড্রোন ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের ‘হত্যা করে নির্মূলের নির্দেশ’ দেওয়া।
- রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাইদ হত্যার ঘটনায় প্ররোচনা, উসকানি, ষড়যন্ত্র, সহায়তা, সম্পৃক্ততার অভিযোগ।
- গত বছরের ৫ই আগস্ট রাজধানীর চাঁনখারপুল এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দ্বারা ছয়জনকে গুলি করে হত্যার অভিযোগ।
- আশুলিয়ায় জীবিত একজনকেসহ মোট ছয়জনকে পুড়িয়ে হত্যার অভিযোগ।
রাষ্ট্রপক্ষ মামলার শুনানিকালে বারবার অভিযোগ করে যে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী সব ধরনের অপরাধের ‘মাস্টারমাইন্ড’ অর্থাৎ পরিকল্পনাকারী, হুকুমদাতা ও সুপিরিয়র কমান্ডার বা সর্বোচ্চ নির্দেশদাতা’ ছিলেন শেখ হাসিনা।
এই মামলায় একমাত্র গ্রেপ্তারকৃত আসামি ছিলেন সাবেক আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন, যিনি এই মামলায় ‘অ্যাপ্রুভার’ বা রাজসাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দিয়েছেন।
মামলায় আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী, আহত ব্যক্তি ও প্রতক্ষ্যদর্শী, আহতদের চিকিৎসা দানকারী চিকিৎসকসহ মোট ৫৪ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন। এছাড়া শেখ হাসিনার কথোপকথনের অডিও, ভিডিও, গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন এবং জব্দ করা গুলি ট্রাইব্যুনালের প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় গঠিত হলেও, ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট সরকার পতনের পর এই ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করা হয়।
পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনালেই শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় প্রথম মামলা (মিসকেস বা বিবিধ মামলা) হয়।
- ১৭ই অক্টোবর (গত বছর): পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনালের প্রথম বিচার কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয় এবং ওইদিনই শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়।
- মার্চ (এই বছর): সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান এবং সাবেক আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুনকে এ মামলায় আসামি করার আবেদন মঞ্জুর করে ট্রাইব্যুনাল।
- ১০ই জুলাই: তিন আসামির বিরুদ্ধে পাঁচ অভিযোগে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে বিচার শুরুর নির্দেশ দেওয়া হয়। প্রসিকিউশন পক্ষ অভিযোগের সময়কাল নির্ধারণ করেছিল ২০০৯ সালের ৬ই জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট পর্যন্ত।
- ১২ই অক্টোবর: সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে যুক্তি-তর্ক শুরু হয়।
- ২৩শে অক্টোবর: যুক্তি-তর্ক শেষ হয়। ওইদিনই চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম এবং অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খানের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার দাবি জানান।
রায় ঘোষণার সময় জনাকীর্ণ আদালতে আইনজীবীরা ছাড়াও জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে নিহতদের কয়েকজনের পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। এই রায় বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হলো।
আরো পড়ুন: https://banglaralo24tv.com/










