নিজস্ব প্রতিনিধি:
একটি পা নেই। শরীরজুড়ে অসুস্থতার ছাপ। সংসারে নেই এক ইঞ্চি জমিও, নেই স্থায়ী আয়ের কোনো উৎস। তারপরও বেঁচে থাকার লড়াইয়ে ভিক্ষার পথ বেছে নেননি মো. আবু তাহের (৫০)। শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে অটোরিকশা চালিয়ে এতদিন নিজের সংসার সচল রেখেছিলেন তিনি। কিন্তু কপালের নির্মম পরিহাসে আজ সেই অটোরিকশাটিও হারিয়ে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। বর্তমানে স্ত্রী জেসমিন বেগমকে নিয়ে চরম মানবেতর দিন কাটছে এই সংগ্রামীর।
চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কেরোয়া গ্রামের বাসিন্দা এই দম্পতির জীবনে এখন বেঁচে থাকার একমাত্র সম্বল ও সবচেয়ে বড় প্রয়োজন একটি অটোরিকশা। তাঁদের বিশ্বাস, বিত্তবান বা কোনো মানবিক সংগঠন যদি একটি অটোরিকশা দিয়ে সহযোগিতা করে, তবে আবারও নিজেদের হাড়ভাঙা শ্রমে সংসারের হাল ধরতে পারবেন আবু তাহের।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় ছয় বছর আগে এক ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন আবু তাহের। জীবন বাঁচাতে চিকিৎসকরা তাঁর একটি পা কেটে ফেলতে বাধ্য হন। অথচ এই দুর্ঘটনার আগেও তিনি ছিলেন একজন কর্মঠ ও সুস্থ মানুষ। দিনমজিসহ যখন যে কাজ পেয়েছেন, তা-ই করে স্ত্রী, দুই মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে পাঁচ সদস্যের সংসার চালিয়েছেন সততার সঙ্গে।.
কিন্তু ওই একটি দুর্ঘটনা আবু তাহেরের সাজানো সংসার ও জীবন ওলটপালট করে দেয়। শারীরিক সক্ষমতা হারানোর পাশাপাশি এই ট্র্যাজেডির পরপরই একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েন তিনি। নিখোঁজ হওয়া ছেলের শোক আর অভাবের তাড়নায় ভেঙে না পড়ে জীবনসংগ্রামে অবিচল থাকেন আবু তাহের। জীবিকার তাগিদে একপর্যায়ে বিশেষ কৌশলে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালানো শুরু করেন তিনি। এক পা না থাকলেও নিজের অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর পরিশ্রমে গাড়ি চালিয়ে যা আয় হতো, তা দিয়েই কোনোমতে চলত তাঁদের সংসার।
তবে সময়ের ব্যবধানে সেই উপার্জনের পথও বন্ধ হয়ে গেছে। অন্যের কাছ থেকে ভাড়া নিয়ে যে অটোরিকশাটি তিনি চালাতেন, সেটির মালিক বর্তমানে নিজেই গাড়িটি চালান। ফলে সম্পূর্ণ কর্মহীন হয়ে পড়েছেন আবু তাহের।
এদিকে সংসারে উপার্জনের কেউ না থাকায় এবং নিজের শারীরিক অসুস্থতার কারণে দিনগুলো আরও দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। দুই মেয়ের বিয়ে হয়ে গেলেও তাঁদের স্বামীরাও দরিদ্র হওয়ায় বাপের বাড়িতে নিয়মিত সহায়তা পাঠানোর সামর্থ্য তাঁদের নেই। নিরুপায় হয়ে বর্তমানে প্রতিবেশীদের দেওয়া খাদ্যসামগ্রী ও সামান্য ত্রাণের ওপর নির্ভর করে দিন পার করতে হচ্ছে এই দম্পতিকে।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে স্ত্রী জেসমিন বেগম বলেন, “আমাদের কোনো জমিজমা নেই। মেয়েদের বিয়ে দিয়েছি, তাদের স্বামীরাও গরিব। প্রতিবেশীরা যা দেয়, তাই দিয়ে খেয়ে না খেয়ে বেঁচে আছি। আমিও অসুস্থ মানুষ। তবে আমার স্বামী অটোরিকশা চালাতে পারেন। কেউ যদি একটি অটোরিকশা দিয়ে সহযোগিতা করেন, তাহলে আমরা ভিক্ষা না করে নিজেরাই উপার্জন করে চলতে পারব।”
আবু তাহেরের চাওয়াও খুব বেশি নয়। তিনি কারও দয়ায় নিয়মিত হাত পেতে বাঁচতে চান না। তাঁর আকুতি, একটি অটোরিকশা পেলে তিনি আবারও ঘাম ঝরিয়ে কাজ করতে পারবেন। নিজের কষ্টে অর্জিত আয়ে মাথা গুজে বেঁচে থাকতে চান সম্মানের সঙ্গে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, শত অভাব-অনটন ও অন্ধকারের মধ্যেও আবু তাহের ভিক্ষাবৃত্তিকে ঘৃণাভরে এড়িয়ে গেছেন। প্রতিবন্ধকতার কাছে হার না মেনে শ্রম দিয়ে বেঁচে থাকার তাঁর এই অদম্য মানসিকতা পুরো এলাকার মানুষের কাছেই এক অনন্য অনুপ্রেরণা। স্থানীয়দের মতে, একটি অটোরিকশা পেলে শুধু আবু তাহেরের কর্মসংস্থানই নিশ্চিত হবে না, বরং তাঁর পুরো পরিবারের জীবনে ফিরবে দীর্ঘদিনের কাঙ্ক্ষিত স্বস্তি। প্রতিদিনের খাবার, ওষুধ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচের জন্য তাঁদের আর অন্যের করুণার ওপর নির্ভর করতে হবে না।
সমাজের বিত্তবান মানুষ, প্রশাসন কিংবা কোনো মানবিক সংগঠন একটু এগিয়ে এলেই হাসি ফুটতে পারে এই লড়াই করা মানুষটির মুখে। একটি অটোরিকশা হয়তো সাধারণ একটি বাহন, কিন্তু আবু তাহের ও জেসমিন বেগমের কাছে এটি একটি পরিবারের নতুন করে বেঁচে থাকার স্বপ্ন। ভিক্ষা নয়, নিজের শ্রমে বাঁচতে চান আবু তাহের—প্রয়োজন শুধু সহযোগিতার একটি সুযোগ।














