নিজস্ব প্রতিনিধি
কথায় আছে, পৃথিবীর সবকিছু ভাগ করা গেলেও স্বামীর ভাগ কাউকে দেওয়া যায় না। চিরচেনা এই সামাজিক ধারণাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে গাজীপুরের চন্দ্রা এলাকায় এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন রুমা আক্তার নামের এক নারী। নিজের ইচ্ছায় ও স্বামীর পছন্দকে প্রাধান্য দিয়ে স্বামীকে দ্বিতীয় বিয়ে করিয়ে ঘরে সতীন এনেছেন তিনি। বর্তমানে দুই সতীন মিলে পরম সৌহার্দ্যে এক অনুকরণীয় সংসার গড়ে তুলেছেন।
আব্দুর রহমানের বড় স্ত্রী রুমা আক্তার জানান,তার স্বামী চার বছর পূর্বে তাকে একদিন বলেন,বর্তমান তার ছোট স্ত্রী নাজনীনকে ভাল লাগে।পরে স্বামীর ভাল লাগাকে প্রাধান্য দিয়ে কাজী অফিসে নিয়ে গিয়ে বিয়ে করিয়ে দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরো বলেন,এখন আমরা তিনজন সুখেই আছি।আমরা এক হাঁড়িতে রান্না করি,এক সাথেই তিনজন বেড়াতে যাই।
গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার চন্দ্রা হরিনহাটি গ্রামের অস্থায়ী বাসিন্দা আব্দুর রহমান।দুই স্ত্রীকে নিয়ে একই ফ্ল্যাটে ভাড়া থাকেন তিনি।গাইবান্ধা জেলার ঝরা বর্ষা গ্রাম থেকে ২০০৬ সালে কর্মের সন্ধানে পাড়ি জমিয়ে ছিলেন গাজীপুরে।
আব্দুর রহমানের সঙ্গে প্রায় ১৭ বছর আগে পারিবারিক ভাবে বিয়ে হয়েছিল রুমা আক্তারের। দীর্ঘ ১৭ বছরের দাম্পত্য জীবনে তাদের দুইটি সন্তান রয়েছে।পরবর্তীতে চার বছর আগে নিজ পছন্দে নাজনীন সুলতানাকে দ্বিতীয় বিয়ে করেন আব্দুর রহমান। বড় স্ত্রী রুমা আক্তার নিজেই স্বামীর পছন্দকে সম্মান জানিয়ে নাজনীনকে সতীনের মর্যাদা দিয়ে ঘরে তুলে নেন।দ্বিতীয় স্ত্রী নাজনীন আক্তারের কোলে ও রয়েছে একটি সন্তান।
সাধারণত সমাজের প্রচলিত প্রেক্ষাপটে দুই সতীনের সংসারে দ্বন্দ্ব, সংঘাত ও দূরত্বই বেশি দেখা যায়। কিন্তু সেই ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে রুমা ও নাজনীন গড়ে তুলেছেন এক অন্যরকম সম্প্রীতির বন্ধন। একটি ছাদের নিচে তারা পরম সুখে বসবাস করছেন। রান্নাবান্না থেকে শুরু করে ঘরের সব কাজ তারা মিলেমিশে ভাগাভাগি করে সম্পন্ন করেন। এমনকি রান্নার হাঁড়ি থেকে শুরু করে একসঙ্গে খাওয়া দাওয়া এবং অবসর সময়ে বাইরে ঘুরতে যাওয়া—সবক্ষেত্রেই তাদের দুই বোন বা পরম বন্ধুর মতো দেখা যায়।
দুই স্ত্রীর এমন পারস্পরিক মিলমিশ ও আচরণে বেজায় সন্তুষ্ট স্বামী আব্দুর রহমান। তবে এই সুখের সংসারেও সমাজকে মুখোমুখি হতে হয়েছে কিছু প্রতিকূলতার। আব্দুর রহমান যখন তার দুই স্ত্রীকে নিয়ে বাইরে বের হন, তখন সমাজের কিছু মানুষ নানা ধরনের কটূক্তি বা বাজে মন্তব্য করেন। তবে এসব নেতিবাচক কথাবার্তাকে তারা কখনো পাত্তাই দেননি। বরং মানুষের কটাক্ষকে তোয়াক্কা না করে তারা নিজেদের ভালোবাসার বন্ধন ও বোঝাপড়াকে আরও শক্ত করেছেন।
আব্দুর রহমান বলেন,আমার স্ত্রীদের নিয়ে রাস্তায় বের হলে অনেকেই বাজে মন্তব্য করে। তখন তাদের আমি বলি,অন্যের সাথে অবৈধ সম্পর্ক রাখার থেকে দ্বিতীয় বিয়ে করা উত্তম। আমি আমার দুই বউকে সমান ভাবেই দেখি। তাদের যখন যা লাগে সমানভাবেই দুজনকে এনে দেই। আমরা খুব সুখে আছি।
পরস্পরের প্রতি সম্মান, বিশ্বাস আর ত্যাগের মানসিকতা থাকলে যে বিরোধের পরিবর্তে শান্তি ও সুখের সংসার গড়ে তোলা সম্ভব, রুমা ও নাজনীন সেটাই প্রমাণ করে দেখিয়েছেন। সমাজের চিরাচরিত নিয়ম ভেঙে এই দুই সতীনের সম্প্রীতির গল্প এখন পুরো গাজীপুর জুড়েই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।














