ডেক্স রিপোর্ট;
একসময় কোলে-পিঠে করে বড় করেছেন মেয়েকে। কিন্তু পারিবারিক নির্যাতনের কারণে স্বামীর সংসার ছেড়ে বাবার বাড়িতে ফিরে আসার পর আর মেয়েকে নিজের কাছে ফিরিয়ে নিতে পারেননি চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলা ছেংগারচর পৌর এলাকার বারোআনী গ্রামের আমেনা আক্তার (৩৭)। দেখতে দেখতে কেটে গেছে প্রায় দুই দশক। মেয়ের সঙ্গে নেই নিয়মিত যোগাযোগ, জানা নেই সে কোথায় আছে, কেমন আছে। মায়ের কাছে এখন মেয়ের স্মৃতি বলতে রয়ে গেছে এক বছর বয়সের একটি ছবি।
হারিয়ে যাওয়া মেয়েকে একনজর দেখার আকুতি নিয়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন এই মা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মেয়ের ছবিটি ছড়িয়ে দিয়ে তাকে খুঁজে পেতে সবার সহযোগিতা চাইছেন তিনি। জীবনের শেষ সময়ে হলেও মেয়েকে একবার বুকে জড়িয়ে ধরতে চান আমেনা। তার বিশ্বাস, মেয়েকে ফিরে পেলে জীবনের সব কষ্ট কিছুটা হলেও সার্থক হবে।
আমেনা আক্তারের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় ২৫ বছর আগে নেত্রকোনার মৈশাদী গ্রামের রফিকুল ইসলামের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। বিয়ের পর স্বামীর সঙ্গে গাজীপুরের রাজেন্দ্রপুর চৌরাস্তা এলাকার বাংলা বাজারের বাদুরপুর গ্রামে ভাড়া বাসায় থাকতেন তিনি। তার স্বামী একটি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। তাদের সংসারে জন্ম নেয় দুই সন্তান মেয়ে রিমা আক্তার মুন্নি ও ছেলে রিফাত মুন্না।
আমেনার অভিযোগ, তার স্বামী মাদকাসক্ত ছিলেন। নেশার টাকার জন্য তাকে প্রায়ই মারধর করতেন। এমনকি তাদের ছয় মাস বয়সী ছেলেকেও খাটের দিকে ছুড়ে ফেলে দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। স্বামীর পাশাপাশি সন্তানদের নিয়েও অনিশ্চয়তা ও নির্যাতনের মধ্যে দিন কাটছিল তার।
একপর্যায়ে মেয়ের ভবিষ্যৎ ও নিজের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে আমেনা তার বাবা-মাকে বিষয়টি জানান। খবর পেয়ে তারা এসে আমেনাকে ছোট ছেলেসহ নিজেদের বাড়িতে নিয়ে যান। কিন্তু মেয়েটি তখন থেকে যায় তার দাদি ও বাবার পরিবারের কাছে। এরপর নানা কারণে আর মেয়েকে নিজের কাছে ফিরিয়ে নিতে পারেননি আমেনা।
সেই বিচ্ছেদের পর কেটে গেছে বছরের পর বছর। মেয়ের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য বিভিন্নভাবে চেষ্টা করেছেন তিনি। আমেনার দাবি, প্রায় ১০-১২ বছর আগে বোনের স্বামীর মাধ্যমে একবার মেয়ের সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছিল। তখন মেয়ে তাকে নিজের কাছে নিয়ে যাওয়ার আকুতি জানিয়েছিল বলে জানান তিনি। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ব্যবহৃত সিমটি নষ্ট হয়ে যাওয়া এবং নতুন করে যোগাযোগের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আর কথা বলা সম্ভব হয়নি।
মেয়ের সঙ্গে শেষ কবে কথা হয়েছিল, তা নিয়েও তার স্মৃতিতে কিছুটা অস্পষ্টতা রয়েছে। তবে দীর্ঘদিন ধরে মেয়ের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই এই কষ্টই তাকে প্রতিনিয়ত তাড়া করে বেড়ায়।
অন্যদিকে, আমেনা জানান, তার ছেলে রিফাত মুন্না বর্তমানে অসুস্থ এবং প্রতিবন্ধিতার কারণে স্বাভাবিকভাবে কাজকর্ম করতে পারে না। সংসারের নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও মেয়েকে খুঁজে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা তার মন থেকে মুছে যায়নি।
মেয়ের এক বছর বয়সের একটি ছবি যত্ন করে রেখে দিয়েছেন আমেনা। সেই ছবিই এখন তার হারানো মেয়েকে খুঁজে পাওয়ার শেষ অবলম্বন। মেয়ের বাবার বাড়ি ও নানার বাড়ির ঠিকানাসহ ছবিটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে মেয়েকে খুঁজে পেতে মানুষের সহযোগিতা কামনা করছেন তিনি।
আমেনা আক্তারের আকুতি, মেয়েটাকে জীবনে অন্তত একবার দেখতে চাই। মৃত্যুর আগে যদি আমার মেয়েকে একবার দেখতে পারি, তাহলে মরেও শান্তি পাব। কেউ যদি আমার মেয়ের সন্ধান দিতে পারেন, তাহলে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করবেন।
দীর্ঘদিনের বিচ্ছেদ, স্মৃতিতে জমে থাকা কষ্ট আর মেয়েকে ফিরে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা সবকিছু নিয়েই অপেক্ষা করছেন আমেনা। তার এই অপেক্ষার অবসান হবে কি না, তা জানা নেই। তবে মায়ের বিশ্বাস, কোনো একদিন হয়তো মেয়ের কাছেও পৌঁছে যাবে তার এই আকুতি।
মেয়ের সন্ধান পেতে সহযোগিতা কামনা আমেনা আক্তার তার মেয়ে রিমা আক্তার মুন্নিকে খুঁজে পেতে সবার সহযোগিতা চেয়েছেন। কেউ তার মেয়ের সন্ধান জানলে কিংবা মেয়েটি নিজে এই সংবাদ দেখে পরিচয় নিশ্চিত করতে পারলে, মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করার অনুরোধ জানানো হয়েছে।














